এডিসিতে ৪৩ বছর পরও বাঁশের স্ট্রেচার: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কোথায়?

এডিসি গঠনের ৪৩ বছর ইতিহাস, প্রতিশ্রুতি আর জোলাইবাড়ির বাঁশের স্ট্রেচারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ এডিসি এলাকা জুড়েই কি একই চিত্র?

নিজস্ব প্রতিনিধি ।। স্বাধীনতার এত বছর পর, ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াজ অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি) গঠনের ৪৩ বছর পার হয়ে গেলেও জোলাইবাড়ির প্রত্যন্ত এলাকায় আজও পৌঁছায়নি চলাচলযোগ্য একটি রাস্তা। সম্প্রতি এলাকার এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো ন্যূনতম সুযোগও ছিল না পরিবারের কাছে। বাধ্য হয়ে বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে, কাঁধে বহন করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা।
এই দৃশ্য শুধু জোলাইবাড়ির একার নয়। সম্পূর্ণ এডিসি এলাকা জুড়েই এমন বহু প্রত্যন্ত জনপদ আজও উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে। রাস্তা নেই, পানীয়জলের সুব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর ন্যূনতম পথ নেই  এমন এলাকার সংখ্যা কম নয়। জোলাইবাড়ির ঘটনা তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সম্পূর্ণ এডিসি এলাকার অসংখ্য প্রান্তিক জনপদের প্রতিচ্ছবি মাত্র। আর এই বাস্তবতাই আজ নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে ৪৩ বছরে এডিসি প্রকৃতপক্ষে জনজাতিদের জন্য কী করেছে?
এডিসি গঠনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জনজাতিদের নিজস্ব শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষার দাবিতে দীর্ঘদিনের গণআন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ভারতীয় সংসদে পাস হয়েছিল টিটিএএডিসি অ্যাক্ট, ১৯৭৯। এরপর ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জেলা পরিষদ প্রথম গঠিত হয় সংবিধানের সপ্তম তফসিলের অধীনে, এবং ১৮ জানুয়ারি নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নেন। পরবর্তীতে জনজাতিদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে কাউন্সিলকে আনা হয় ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় যার কার্যকারিতা শুরু হয় ১৯৮৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে। সেই বছরই ৩০ জুন নতুন করে নির্বাচন হয় এবং ১৯ জুলাই শপথ নেন নির্বাচিত সদস্যরা। বর্তমানে রাজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড প্রায় ৭ হাজার ১৩২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা, যেখানে বসবাস করেন প্রায় ১২ লক্ষাধিক মানুষ, যাদের অধিকাংশই জনজাতি  এই কাউন্সিলের এক্তিয়ারভুক্ত।
এডিসি গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট। উন্নত ও অনুন্নত অংশের মধ্যেকার বৈষম্য অল্প সময়ে দূর করা, জনজাতি ও অ-জনজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করা, এবং ঐতিহাসিক কারণে সমাজের দুর্বলতর অংশে থেকে যাওয়া জনজাতি মানুষদের সব ধরনের অন্যায় ও শোষণ থেকে মুক্ত করা এই ছিল ঘোষিত অঙ্গীকার। অর্থাৎ এডিসি কোনো বিভেদের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে গঠিত হয়নি গঠিত হয়েছিল উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে, জনজাতি জনগণকে রাজ্যের মূল উন্নয়ন-স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে।
কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? ৪৩ বছরে সম্পূর্ণ এডিসি এলাকায় প্রকৃত অর্থে কী উন্নয়ন হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসেব আজও কারও কাছে নেই। রাস্তা, পানীয়জল, শিক্ষা আর কর্মসংস্থান এই চারটি ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা, যা যেকোনো জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত, তা-ই যখন আজও বহু এলাকায় সুনিশ্চিত হয়নি, তখন প্রশ্ন ওঠে জনজাতিদের প্রকৃত প্রয়োজন এখন কী? ল্যান্ড রাইট, ডাইরেক্ট ফান্ডিং, রোমান স্ক্রিপ্ট এইসব বিষয় নিয়ে যত জোরালো রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণাই চলুক না কেন, এইসব ইস্যু আসলে কতটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট লাঘবে কাজে আসছে? বাস্তবতা হলো, আগে দরকার রাস্তা, পানীয়জল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান। জোলাইবাড়ির বৃদ্ধা বাঁশের স্ট্রেচারে হাসপাতালে যাচ্ছেন  এই একটি দৃশ্যই বলে দেয়, অগ্রাধিকারের প্রশ্নে নীতিনির্ধারণ আর মাটির বাস্তবতার মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।
এডিসি গঠনের পর থেকে একের পর এক সরকার এসেছে, একের পর এক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় বসেছে এডিসিতে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে জনজাতি জনগণের নামে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটে, কিন্তু ভোট মিটে গেলে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে যায় কাগজেই। বাস্তব উন্নয়নের বদলে জনজাতি-অজনজাতি বিভাজনের রাজনীতি, পরিচয়ভিত্তিক আবেগের রাজনীতিই বারবার সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে ৪৩ বছর পরও কেন শুধু রাজনীতিই হবে, উন্নয়ন কেন হবে না? জনজাতিদের এই প্রশ্নের উত্তর কোন রাজনৈতিক দলের কাছে আছে? যারা শুধু ল্যান্ড রাইট, ডিরেক্ট ফান্ডিং আর রোমান স্ক্রিপ্টের রাজনীতি নিয়ে বছরের পর বছর ব্যস্ত থেকেছে, তারা বর্তমান ফান্ডিং,এ কি প্রকৃত অর্থে কোনো উন্নয়ন করতে পেরেছে? এটাই এখন দেখার বিষয়। অথচ এডিসি প্রতিষ্ঠার সময়ে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল জনজাতি ও অ-জনজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে সবাইকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনার তার সঙ্গে এই বিভেদের রাজনীতির কোনো সাযুজ্য নেই। এডিসি শুধু বিভেদের রাজনীতির জন্য গঠিত হয়নি গঠিত হয়েছিল উন্নয়নের জন্য।
সম্পূর্ণ এডিসি এলাকা জুড়ে আজও পাকা রাস্তা পৌঁছায়নি বহু জনপদে। ফলে সামান্য অসুস্থতা হলেও মানুষকে নির্ভর করতে হয় নিজেদের কাঁধ আর বাঁশের অস্থায়ী স্ট্রেচারের ওপর। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একটি চলনযোগ্য মাটির রাস্তাও নেই এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এডিসির নামে বরাদ্দ হয়েছে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিপুল অর্থ। প্রশ্ন এখানেই সেই অর্থের কতটা প্রকৃতপক্ষে পৌঁছেছে জোলাইবাড়ির মতো এবং এডিসির অন্যান্য প্রান্তিক জনপদে? রাস্তা, পানীয়জল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থানের সুযোগ এই মৌলিক অবকাঠামোগুলোর অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ হিসেব জনসমক্ষে তুলে ধরার দায়িত্ব যাদের, তারা কি কখনো তা তুলে ধরেছেন? জনজাতিদের নামে বছরের পর বছর রাজনীতি করে যাওয়া দলগুলোর কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে।
এডিসি জনজাতিদের আত্মমর্যাদা আর অধিকারের প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই প্রতীক যদি রাস্তার অভাবে একজন অসুস্থ বৃদ্ধাকে বাঁশের স্ট্রেচারে বহন করার করুণ দৃশ্যেই আটকে থাকে, তাহলে ৪৩ বছরের এই যাত্রার প্রকৃত অর্থ নিয়েই প্রশ্ন তোলা জরুরি। উন্নয়নের নামে রাজনীতি নয়, প্রকৃত উন্নয়নই এখন সময়ের দাবি  এই দাবিতেই সরব হচ্ছেন এডিসি এলাকার সাধারণ মানুষ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ