এডিসির স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা পাঁচ বছরের হিসাব, চাকরি কেলেঙ্কারি এবং বিজেপির ভরাডুবির আসল কাহিনি
এডিসি গঠনের সময় কী বলা হয়েছিল?
১৯৭৯ সালে সংসদে টিটিএএডিসি আইন পাস হয়। ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রথম নির্বাচন এবং ১৮ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় এডিসি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী মানুষকে স্বশাসনের অধিকার দেওয়া এবং তাদের সংস্কৃতি, প্রথা ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে সক্ষম একটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো তৈরি করা।
এডিসি গঠনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সমাজের অগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যে বৈষম্য দূর করা, জনজাতি ও অ-জনজাতি জনগণের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন মজবুত করা, এবং শুধু আদিবাসী নয়, সমস্ত বঞ্চিত মানুষকে শোষণ ও অন্যায় থেকে মুক্ত করা। সেই ঘোষণাপত্রেই স্পষ্ট বলা ছিল "টিটিএএডিসি হবে রাজ্যের জনজাতি ও অ-জনজাতি মানুষের সংহতি, সম্প্রীতি এবং ঐক্যের প্রতীক।এটাই ছিল সেই মহান প্রতিশ্রুতি পাহাড়ের আদিবাসী মানুষের স্বায়ত্তশাসন, উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষার শপথ নিয়ে এডিসি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে সেই স্বপ্নের বাস্তব ছবিটা কেমন? পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে আজও পানীয় জলের সংকট, বিদ্যুৎ নেই, রাস্তা ভাঙা, হাসপাতাল অকার্যকর। তাহলে এডিসি কার কাজে এল?
তিপ্রা মথার পাঁচ বছর শুধু আবেগের রাজনীতি, উন্নয়নের খাতা শূন্য?
২০২১ সালে তিপ্রা মথা এডিসির ক্ষমতায় এসেছিল বিশাল প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু ২০২৬ এর ফলাফল ঘোষণার পরই কংগ্রেস ও সিপিআই(এম) সরাসরি অভিযোগ করেছে তিপ্রা মথা পাঁচ বছর পরিষদ শাসন করেছে কিন্তু উপস্থাপন করার মতো কোনও রিপোর্ট কার্ড তাদের নেই। জনজাতির জমি বেদখলের ভয় দেখিয়ে এবং আবেগের স্লোগান দিয়ে তারা তাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢেকে রেখেছে। প্রচারণায় বিজেপির রাজীব ভট্টাচার্য সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন "খুমুলুংয়ে একটি হাসপাতালের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, সেটা কেন তৈরি হয়নি? স্মোকহাউসের জন্য অর্থ এসেছিল, সেই টাকা কোথায় গেল?"
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহাও প্রচারণায় দাবি করেছেন, রাজ্য সরকার যখনই তহবিল পাঠিয়েছে, পরিষদ প্রশাসন সেই অর্থ জনজাতির উন্নয়নে না লাগিয়ে কীভাবে ব্যবহার করবে তা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে। তাঁর দাবি,এডিসিতে চলছে শুধু লুটের রাজত্ব।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। তিপ্রা মথা এডিসিতে ক্ষমতায় আছে, একই সঙ্গে বিজেপির সাথে রাজ্য সরকারেও তাদের জোট। তাহলে রাজ্য সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ যদি সঠিকভাবে ব্যয় না হয়, তাহলে এডিসি ও রাজ্য দুই স্তরেই তারা প্রভাবশালী থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ের মানুষের জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছাল না কেন? এর জবাব তিপ্রা মথাকেই দিতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শ্রেণীসংগ্রামের বদলে "পরিচয়ের রাজনীতি" এখন পাহাড়ের রাজনীতির মূল কেন্দ্র হয়ে গেছে। অর্থাৎ বিকাশের চেয়ে "আমরা কে" এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠেছে। এবং তিপ্রা মথা এই আবেগকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছে।
এখন চাকরি কেলেঙ্কারি নতুন বিতর্কের আগুনে জ্বলছে পরিষদ।অভিযোগ উঠেছে, ২০২৬ সালের এডিসি নির্বাচন চলাকালীন সময়ে কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও ইন্টারভিউ ছাড়াই ১২০ জনকে পরিষদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয়েছে।
বিজেপি দাবি করেছে, গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পদে এই নিয়োগগুলি তড়িঘড়ি এবং গোপনে করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ভারতের মহা হিসাব নিরীক্ষক সিএজিও এই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শতশত বেকার আদিবাসী যুবক উত্তর গেটে প্লাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেছে, দাবি জানিয়েছে এই চাকরি কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ তদন্তের। বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ রেবতী ত্রিপুরার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে এবং পরিষদের নির্বাচিত এমডিসিরা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বয়কট করেছে। এখানে দুটো দিক আছে। প্রথমত, বিজেপির এই অভিযোগ মাত্র চারটি আসন পাওয়া একটি পরাজিত দলের রাজনৈতিক হুল ফোটানো কিনা সেটাও বিচার্য। কিন্তু দ্বিতীয়ত, যদি সত্যিই হাজারো যোগ্য বেকার আদিবাসী যুবকের চোখের সামনে বিনা পরীক্ষায় দলীয় বিবেচনায় চাকরি দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে সেটা আদিবাসীর কণ্ঠস্বর হওয়ার দাবি করা দলের কাছে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। এডিসি যাদের জন্য তৈরি, তাদের সাথেই প্রতারণা।
বিজেপির ভরাডুবি ৯ থেকে ৪ আসনে নামার পেছনে কে দায়ী?
২০২১ সালে বিজেপির ৯টি আসন ছিল। ২০২৬ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৪টিতে। বিশ্লেষণ করলে কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১। জনজাতিদের ন্যায্য দাবি সামনে আনতে ব্যর্থতা
বিজেপি বরাবরই এডিসি এলাকায় "উন্নয়ন" ও "ডাবল ইঞ্জিন" এর গল্প বলেছে। কিন্তু পাহাড়ের আদিবাসীর প্রধান দাবি জমির অধিকার, কোকবরক ভাষার স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ এই বিষয়গুলো বিজেপির প্রচারের কেন্দ্রে কখনো আসেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিপ্রা মথার "থানসা" (পরিচয় ও ঐক্যের) রাজনীতির বিপরীতে বিজেপির শুধু "উন্নয়ন" নির্ভর প্রচার আদিবাসী ভোটারদের মনে কোনও আবেগের তার স্পর্শ করতে পারেনি।
২। পুরনো ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অবমূল্যায়ন
মাঠের রাজনীতিতে যারা বছরের পর বছর কাজ করেছেন, তাদের বিজেপি যোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে পারেনি। প্রার্থী মনোনয়নে পুরনো, পরীক্ষিত মুখের বদলে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থী মনোনয়নের অভিযোগ বহুদিনের। এতে স্থানীয় কর্মীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন।
৩। বুথ স্তরে সাংগঠনিক দুর্বলতা
বিশ্লেষণে স্পষ্ট, বিজেপি আদিবাসী অঞ্চলে বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় আদিবাসী নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। তিপ্রা মথার "রাজকীয় ভাবমূর্তি" ও আবেগের বিপরীতে বিজেপির জনজাতি মোর্চার নেতারা কার্যকর প্রতিনেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি। বুথ প্রমুখ ও বিস্তারকরা মাঠে কার্যকরভাবে কাজ করেননি এই অভিযোগও রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
৪। জাতিগত সমীকরণে বিজেপির পরাজয় মনু-ছৈলেংটার উদাহরণ
বেশ কয়েকটি আসনে বিজেপির পরাজয়ের পেছনে জাতিগত ভোটের সমীকরণ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুমান। যেমন মনু-ছৈলেংটার জেনারেল আসনে তিপ্রা মথা চাকমা প্রার্থী দিয়েছিল। ফলে এলাকার চাকমা ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জাতিগত প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এমনকি যে চাকমা ভোটাররা বিজেপিকে সমর্থন করতেন, তাঁরাও এবার তিপ্রা মথার পক্ষে ঝুঁকে পড়েছেন এমনটাই বিশ্লেষকদের ধারণা।একাধিক আসনে সিপিআই(এম)-এর ভোট এমন ছিল যা তিপ্রা মথা ও বিজেপির ব্যবধানের চেয়ে বেশি অর্থাৎ সিপিআই(এম) একটি আসনও না জিতেও "স্পয়লার" হিসেবে বিজেপির বিপক্ষে কাজ করেছে।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এডিসির মূল প্রতিশ্রুতি কি পূরণ হচ্ছে?
এডিসি তৈরি হয়েছিল জনজাতি ও অ-জনজাতির মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু আজ এডিসির রাজনীতি যেন সেই ঐক্যের বদলে জাতিগত বিভাজনের অস্ত্র হয়ে উঠছে। যে প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল "সমস্ত বঞ্চিত মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে", সেই প্রতিষ্ঠানে এখন দলীয় রঙে চাকরি বিতরণের অভিযোগ উঠছে। তিপ্রা মথা "থানসা"-র নামে আদিবাসীর পরিচয় রক্ষার কথা বলেছে এটা অনুভূতির জায়গা থেকে সত্য। কিন্তু পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে এবং রাজ্য সরকারের সাথে জোট করেও যদি পাহাড়ের গ্রামে পানীয় জল না পৌঁছায়, হাসপাতাল না তৈরি হয়, বরাদ্দ অর্থের হিসাব না থাকে তাহলে পরিচয়ের রাজনীতি একটা দিন শেষ পর্যন্ত মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারে না।
বিজেপির ব্যর্থতাও সমান স্বীকার্য। রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন হয়েও এডিসি এলাকায় তারা জনজাতির আস্থা অর্জন করতে পারেনি। পুরনো কর্মীদের অবমূল্যায়ন, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং আদিবাসীর আবেগকে না বুঝে শুধু "উন্নয়নের পরিসংখ্যান" দিয়ে জনমন জয়ের চেষ্টা — এই ব্যর্থতা বিজেপির নিজের তৈরি।তিপ্রা মথা জিতেছে এটা সত্য। কিন্তু জয় মানেই কি শাসনের সাফল্য? পাহাড়ের মানুষ প্রতিবার আশা নিয়ে ভোট দেয়। তারা জিজ্ঞেস করে আমার গ্রামে জল এল? আমার ছেলে চাকরি পেল? আমার মেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা পেল?
এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু "থানসা"-র স্লোগান দিলে পাঁচ বছর পরে আবার একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আদিবাসীর আবেগকে রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকা যায়, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শুধু একটাই প্রশ্ন করে তুমি কি সত্যিই মানুষের জীবন বদলেছিলে?এই প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে, পাঁচ বছর পরে তিপ্রা মথার রিপোর্ট কার্ডের পরিণতি কী হবে সেটা ইতিহাসই বলবে।

0 মন্তব্যসমূহ