ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা, তবু ভগিরত পাড়ার কিশোরীর হাতে কলম নয় — তাঁতের মাকু
সুব্রত দাস গন্ডাছড়া, ধলাই, ৫ এপ্রিল :-পাহাড়ের কোলে গন্ডাছড়ার ভগিরত পাড়া। একটুখানি বাঁশের মাচা। সেখানে মার সঙ্গে বসে এক কিশোরী নিপুণ হাতে বুনে চলেছে পাচরা। দৃশ্যটি দেখলে মন ভরে যায় মনে হয়, এই তো আমাদের জনজাতি সংস্কৃতির গর্বিত উত্তরাধিকার। কিন্তু একটু কাছে গিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা যায়, "মা, আজ স্কুলে গেলি না কেন?" সেই উত্তরটি আর গর্বের থাকে না। উত্তরটি হয়ে ওঠে এই পাহাড়ি জনপদের এক নির্মম সামাজিক দলিল। মেয়েটি স্কুলে যায়নি। কারণ একটাই সংসারে অন্ন নেই, দারিদ্র্যে দিন কাটে। পরিবারের চরম আর্থিক অনটনে এই কিশোরীর কাঁধে এখন ভবিষ্যতে টাকা রোজগারের পথ তৈরী করা । যে বয়সে তার পাঠ্যবইয়ের পাতায় পৃথিবীকে চেনার কথা, সেই বয়সে সে সংসারের টান সামলাতে সুতোর প্যাঁচে নিজের ভবিষ্যৎ বুনছে। এটি ঐতিহ্যের চর্চা নয় এটি দারিদ্র্যের কাছে আত্মসমর্পণ। ভগিরত পাড়ার এই কিশোরী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিনিধি নয়। সে আসলে ত্রিপুরা উপজাতি অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ — TTAADC — এর বিস্তৃত ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত শত শিশুর প্রতিচ্ছবি। গন্ডাছড়া থেকে অম্পিনগর, রাইমাভ্যালি থেকে গঙ্গানগর, মনু থেকে তবলছড়া এডিসির প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে স্কুলছুট শিশুর সংখ্যা কোনো পরিসংখ্যানে ধরা নেই। কিন্তু প্রতিটি পাড়ায় এই একই দৃশ্য মাচায় বসে তাঁত বুনছে কিশোরী, মাঠে কাজ করছে কিশোর, ক্লাসরুমে তাদের আসন শূন্য। ধলাই জেলার গন্ডাছড়া মহকুমা, খোয়াই জেলার তুলাশিখর, উত্তর ত্রিপুরার কাঞ্চনপুর এডিসির বিভিন্ন প্রান্তে একই বাস্তবতা। অভিভাবকদের দৈনিক মজুরি এত কম যে সংসার চালাতে ছেলেমেয়েদেরও কাজে লাগাতে হয়। মেয়েরা তাঁত বোনে, ছেলেরা জুম চাষে হাত লাগায় বা বাগানে কাজ করে। পড়াশোনা তখন বিলাসিতা হয়ে যায়। ভারত সরকারের সর্বশিক্ষা অভিযান যা পরবর্তীতে সমগ্র শিক্ষা অভিযান নামে পরিচিত চালু হয়েছে ঠিক এই উদ্দেশ্যেই। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়মুখী হওয়া নিশ্চিত করা, ঝরে পড়া রোধ করা, এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা যাতে অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এটাই এই প্রকল্পের মূল প্রতিশ্রুতি। বিনামূল্যে বই, মিড-ডে মিল, পোশাক সহায়তা সব কিছু এই প্রকল্পের আওতায় আসার কথা। তাহলে ভগিরত পাড়ার এই মেয়েটি কি সর্বশিক্ষার আওতার বাইরে? নাকি প্রকল্পটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, পাহাড়ের এই প্রত্যন্ত পাড়া পর্যন্ত তার আলো পৌঁছায়নি? এডিসি অঞ্চলে শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কি একবারও এই পাড়ায় এসেছেন? ঝরে পড়া শিশুদের তালিকায় এই কিশোরীর নাম কি কেউ তুলেছেন?এডিসি অঞ্চলের বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য। কোনো কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজনমাত্র শিক্ষক একাধিক শ্রেণির পাঠদান করছেন। দূরের পাড়া থেকে পাকা রাস্তা নেই বলে শিশুরা বর্ষায় বিদ্যালয়ে পৌঁছাতেই পারে না। এই পরিস্থিতিতে মিড-ডে মিলের চাল পৌঁছায়, কিন্তু শিক্ষার আলো পৌঁছায় না।
এডিসি পরিষদের ক্ষমতা আছে, দায়িত্ব কোথায়?
ত্রিপুরা উপজাতি অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ — TTAADC — গঠিত হয়েছে সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলের অধীনে। পরিষদের হাতে রয়েছে শিক্ষা, কৃষি, বন, সামাজিক কল্যাণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জনজাতি সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ একাধিক বিভাগ পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই পরিষদ নিজেই আইন প্রণয়ন করতে পারে। নিজেই বাজেট তৈরি করে। নিজেই কর্মকর্তা নিয়োগ করে।
গত পাঁচ বছর এডিসিতে ক্ষমতায় ছিল তিপ্রা মথা। তার আগে দীর্ঘ সময় ছিল সিপিআইএম। ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে, কিন্তু গন্ডাছড়ার ভগিরত পাড়ার ছবি বদলায়নি। এডিসির শিক্ষা বিভাগ, সামাজিক কল্যাণ দফতর এই দফতরগুলোর বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে? গত পাঁচ বছরে এডিসি বাজেটে শিশু-শিক্ষা ও ঝরে পড়া রোধে কত টাকা খরচ হয়েছে সেই হিসাব কি পরিষদ জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে? পরিষদের সামাজিক কল্যাণ দফতরের কি কোনো দায় নেই এই পরিবারগুলোর দিকে? সাধারণ জনগণের অভিযোগ গন্ডাছড়ার মতো এডিসির বহু প্রত্যন্ত এলাকায় এমন অসংখ্য শিশু রয়েছে যারা এখনো স্কুলে যায় না অর্থের অভাবে। এই শিশুদের তালিকা কি কোনো পরিষদ সদস্যের কাছে আছে?এডিসি নির্বাচনের মাঠ এখন সরগরম। মাইকে ভেসে আসছে একের পর এক প্রতিশ্রুতির ঢেউ। কেউ বলছেন, "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে আমাদের ভোট দিন।" কেউ বলছেন, "উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের পাশে থাকুন।" বিজেপি থেকে কংগ্রেস, সিপিআইএম থেকে আইপিএফটি, তিপ্রা মথা সব দলের নেতারা ছুটে আসছেন এই পাহাড়ে। ক্যামেরার সামনে বুক ফুলিয়ে বলছেন, "জনজাতির অধিকার রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" তিপ্রা মথা গ্রেটার টিপ্রাল্যান্ডের স্বপ্ন দেখায়। বিজেপি দিল্লির উন্নয়নের গল্প শোনায়। সিপিআইএম ও কংগ্রেস ঐতিহাসিক অধিকারের কথা বলে। কিন্তু বক্তৃতার ভাষা যতই উজ্জ্বল হোক, ভগিরত পাড়ার এই কিশোরীকে দেখলে একটাই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মাথায় আসে এটাই কি সেই ভবিষ্যৎ? যে ভবিষ্যতের কথা বলে ভোট চাওয়া হচ্ছে, সেই ভবিষ্যতের প্রতিনিধি একটি কিশোরী আজ স্কুলছুট হয়ে তাঁতের সামনে বসে আছে। এডিসি নির্বাচন এলেই এই পাহাড়ি মানুষগুলো হঠাৎ করে সবার কাছে অমূল্য হয়ে ওঠেন। ভোট শেষ হলে? ভগিরত পাড়া তখন আবার নীরব। সেই কিশোরী তখন আবার তাঁতের সামনে বসে যায়। তার জন্য কোনো বৃত্তির ব্যবস্থা হয় না, কোনো সামাজিক সুরক্ষার জাল পৌঁছায় না, কোনো কর্মকর্তার পা পড়ে না তাদের পাড়ায়। জনজাতিদের নিয়ে রাজনীতিটা একটি চেনা ছক হয়ে গেছে ভোটের আগে আবেগ, ভোটের পরে বিস্মরণ। পাচরা বোনা গর্বের। জনজাতি সংস্কৃতির সংরক্ষণ জরুরি। কিন্তু যখন কোনো শিশুকে অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে তাঁতের সামনে বসতে হয়, তখন সেই সংস্কৃতি আর রক্ষার বিষয় থাকে না সেটা হয়ে ওঠে দারিদ্র্যের আরেকটি মুখোশ। "ওরা তো এমনিই থাকে, এটাই ওদের জীবন" এই মানসিকতা দিয়ে দশকের পর দশক ধরে এডিসি অঞ্চলের জনজাতি শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে কি? এই প্রশ্নটা আমাদের নয় জনগণের ।
এই মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে প্রতিটি প্রার্থীকে। শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে নয়, ক্ষমতায় গিয়ে কাজে। এডিসি নির্বাচনের প্রার্থীরা যখন এই অঞ্চলে প্রচারে আসবেন, তখন তাদের কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন রাখা দরকার।ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বলে আপনি ভোট চাইছেন। সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি মেয়ে আজ স্কুল ছেড়ে তাঁতে বসে আছে। জনগণ জানতে চাই তাকে আপনি কবে স্কুলে ফেরাবেন?
এডিসি এলাকায় কতজন শিশু এখন স্কুলছুট সেই পরিসংখ্যান কি আপনার কাছে আছে?
সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অর্থ এডিসির প্রত্যন্ত পাড়ায় পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে আপনি কী করবেন?
পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা কতটা কমানো গেছে তার হিসাব কি বিদায়ী পরিষদ দিতে পারবে?
রঙিন সুতোর পাচরায় ঐতিহ্য বেঁচে থাকুক। কিন্তু সেই পাচরা বোনার সঙ্গে যেন হাতে একটি পাঠ্যবইও থাকে। ভগিরত পাড়ার এই কিশোরীর স্কুলে ফেরার অধিকার আছে। সর্বশিক্ষা অভিযানের প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে সেই প্রকল্প কেবল সরকারি ফাইলের পাতাতেই বেঁচে থাকবে ভগিরত পাড়ার মতো এডিসির প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুর কাছে পৌঁছাবে না। আর ভোটের প্রতিশ্রুতিগুলোও প্রতিবারের মতো পাহাড়ি বাতাসে মিলিয়ে যাবে পরের ভোট না আসা পর্যন্ত।

0 মন্তব্যসমূহ