মৃত্যুর দরজায় ১৪ বছরের ধমিজয় — দুই হাজার টাকায় দায় সেরে নিল প্রশাসন
গণ্ডাছড়া, ধলাই জেলা:গণ্ডাছড়া মহকুমার ধলাঝাড়ি এডিসি ভিলেজের বিশ্বরাম পাড়ায় গত চার বছর ধরে বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে ১৪ বছরের কিশোর ধমিজয় রিয়াং। প্রকাশজয় পাড়া বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এই ছাত্রটির বাম পায়ের হাঁটুর উপরে প্রায় চার বছর আগে একটি সামান্য গুটি দেখা দিয়েছিল। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় সেই ছোট্ট ফোঁড়াই আজ ভয়াবহ জটিল ক্ষতে পরিণত হয়েছে। পুঁজ বের করতে এখন বাঁশের তৈরি পাইপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিছানা থেকে সরানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। চার বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে তার পড়াশোনা, থমকে গেছে একটি শিশুর গোটা জীবন।
আর এই অবস্থায় প্রশাসনের "সহায়তা"? মহকুমাশাসকের কার্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে পনেরোশো টাকা, সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের অফিস থেকে পাঁচশো টাকা। মোট দুই হাজার টাকায় একটি মুমূর্ষু শিশুর প্রতি দায় সেরে নিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র। এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস আর কী হতে পারে?ধমিজয়ের বাবা খাতানজয় রিয়াং একজন জুমচাষি ও দিনমজুর। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। তবু ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া এই বাবা নিজের পুকুর বিক্রি করেছেন, রেশন কার্ড বন্ধক রেখে ছাগল বেচেছেন, একের পর এক কুড়িজন কবিরাজ দেখিয়েছেন। তারা প্রত্যন্ত অরণ্যের অসহায় জনজাতি মানুষ হাসপাতালের পথ অচেনা, সরকারি দপ্তরের দরজা কোথায় সে জ্ঞান নেই। তাই কবিরাজের উপরই ভরসা রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মহকুমা স্বাস্থ্য দপ্তর কোথায় ছিল? সচেতনতামূলক কর্মসূচির নামে বছরে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, অথচ মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই পরিবারটির কাছে একজন স্বাস্থ্যকর্মীও পৌঁছাননি তিন বছরে? ওই এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীরা কেন একটিবারও খোঁজ নিলেন না? প্রত্যন্ত জনজাতি এলাকার শিশুদের কি বাঁচার অধিকার নেই?ধমিজয়ের নাম পরিবারের রেশন কার্ডে নেই। আধার কার্ড আপডেট হয়নি। আয়ুষ্মান ভারত বা আয়ুষ্মান বন্ধু কোনো স্বাস্থ্যবিমার আওতায় সে নেই। কোনো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পেও পরিবারটির নাম নথিভুক্ত নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা-সহ যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা এই পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ অধরা। কাগজপত্র তৈরির জ্ঞান বা সামর্থ্য কোনোটাই নেই এই অসহায় পরিবারের আর সেই সুযোগেই রাষ্ট্র তাদের অস্তিত্বকেই মুছে দিয়েছে নথির দুনিয়া থেকে।
গণ্ডাছড়া শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের বিশ্বরাম পাড়ায় গত চার বছরে স্বাস্থ্য দপ্তর, মহকুমাশাসক কার্যালয়, ধলাই জেলা প্রশাসন বা কোনো জনপ্রতিনিধি একবারের জন্যও আসেননি। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়, কিন্তু ভোটের পরে এই হতদরিদ্র জনজাতি পরিবারগুলো আবার অদৃশ্য হয়ে যায় সকলের কাছে। এই বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ত্রিপুরা মানবাধিকার কমিশন স্বাস্থ্য দপ্তরের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণ করেছে। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য দপ্তর ও জেলা প্রশাসন আদৌ নড়েচড়ে বসে কিনা। নাকি মামলা ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে, আর ধমিজয় বিছানায় শুয়েই ধুঁকতে থাকবে?এলাকার সচেতন মহলের দাবি স্পষ্ট অবিলম্বে ধমিজয়কে আগরতলার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। রেশন কার্ডে তার নাম অন্তর্ভুক্ত, আধার কার্ড আপডেট এবং আয়ুষ্মান ভারত কার্ড প্রদান করতে হবে। পরিবারকে সমস্ত প্রযোজ্য কল্যাণ প্রকল্পের আওতায় এনে প্রকৃত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ উন্নয়নের দাবি করার নৈতিক অধিকার রাখে না। ধমিজয় রিয়াংয়ের এই যন্ত্রণাময় জীবনযুদ্ধ শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয় এ হলো প্রত্যন্ত জনজাতি এলাকায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার জ্বলন্ত দলিল। গণ্ডাছড়া মহকুমাশাসক ও ধলাই জেলা প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর জোরালো দাবি এই মুহূর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। একটি শিশুর জীবন আর একটি দিনও অপেক্ষা করতে পারছে না।

0 মন্তব্যসমূহ