ক্ষুধার কাছে হার মানছে ‘গজরাজ’: চার দিনে মৃত ২ হাতি, আশঙ্কায় ত্রিপুরা
প্রতিনিধি: অনুপম পাল | কৈলাসহর
ত্রিপুরার মাটিতে একসময় হাতির পদচারণা ছিল গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। অথচ আজ সেই মাটিতেই ক্ষুধা আর অবহেলায় একের পর এক লুটিয়ে পড়ছে নিরীহ প্রাণ। গত চার দিনের ব্যবধানে উত্তর ও ঊনকোটি জেলায় দুইটি হাতির মৃত্যু—যা শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং এক গভীর মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
গত ৮ এপ্রিল, পেঁচারথলের আন্ধার ছড়া এলাকায় মৃত্যু হয় প্রায় ১৪ বছর বয়সী একটি হাতির। অভিযোগ, পর্যাপ্ত খাদ্য ও সঠিক দেখভালের অভাবেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে প্রাণীটি। মালিক সুধীর নাথের এই হাতিটির মৃত্যু এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এরপর ১০ এপ্রিল, ঊনকোটি জেলার ঠান্ডা ছড়া এলাকায় আরও একটি ৪৫ বছর বয়সী হাতির মৃত্যু হয়। ঘটনাটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক—মৃত হাতিটির পাশে রয়ে গেছে মাত্র চার বছরের একটি অসহায় শাবক। মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শাবকের দৃশ্য এলাকাবাসীর মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই হাতিগুলি একটি বহিরাজ্যের সংস্থার মাধ্যমে গুজরাটে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হচ্ছিল। যদিও আইন অনুযায়ী হাতি কেনাবেচা নিষিদ্ধ, তথাপি ‘দানপত্র’-এর আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই বাণিজ্য চলার অভিযোগ উঠেছে। মন্দিরে দানের নামে হাতিগুলিকে হস্তান্তর করা হলেও, তাদের খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলেই দাবি।
অভিযোগ আরও গুরুতর—দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চরম অবহেলার কারণেই দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হচ্ছে হাতিগুলিকে। ফলে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে।
বর্তমানে পেঁচারথলের আন্ধার ছড়া এলাকায় এখনও পাঁচটি হাতি একই দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও প্রাণহানি অনিবার্য।
ত্রিপুরায় হাতি শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি একটি ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। একসময় কৈলাসহরের বাসিন্দা হাজী চান মিয়া দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি হাতি উপহার দিয়েছিলেন—যা ছিল সম্মানের প্রতীক। অথচ আজ সেই ঐতিহ্যই হারিয়ে যাওয়ার মুখে।
অন্যদিকে, বহু প্রজন্ম ধরে হাতি পালনকারী স্থানীয় মালিকদের অভিযোগ, বন দপ্তর তাদের বৈধ কাগজপত্র প্রদান করছে না। ফলে তারা আইনগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যেখানে বহিরাজ্যের সংস্থাগুলি সহজেই অনুমোদন পাচ্ছে বলে অভিযোগ।
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই একটি সংস্থা ২৬টি হাতি সংগ্রহ করে গুজরাটে নিয়ে গেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ত্রিপুরা থেকে হাতির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পশুপ্রেমী কুন্তলা সিনহা জানিয়েছেন, “যে হাতিগুলি এখনও জীবিত রয়েছে, তাদের অবিলম্বে খাদ্য ও সুরক্ষার ব্যবস্থা না করা হলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।”
প্রশ্ন রয়ে যায়—আর কত প্রাণহানির পর জাগবে প্রশাসন?
ক্ষুধার্ত এই নীরব প্রাণীদের আর্তনাদ কি পৌঁছবে না দায়িত্বশীলদের কানে?

0 মন্তব্যসমূহ