এডিসির জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত জেনারেল আসন সংকোচনের ইতিহাস ও এডিসি এলাকার অ-উপজাতিদের বঞ্চনার কথা
প্রেক্ষাপট কেন তৈরি হয়েছিল এডিসি?
ত্রিপুরার জনজাতি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারা রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। সেই দাবির ফসল হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ, সংক্ষেপে TTAADC বা এডিসি। ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ বিল ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ ত্রিপুরা বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এরপর ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে পরিষদ গঠিত হয়। পরবর্তীতে ভারতীয় সংবিধানের ৪৯তম সংশোধনী আইন ১৯৮৪ অনুযায়ী এটি সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা হয়, যা ১৯৮৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। এডিসি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন এবং উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ সংরক্ষণ। কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে, এডিসি গঠনের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ছিল সমাজের অগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যে বৈষম্য দূর করা, উপজাতি ও অ-উপজাতি জনগণের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং কেবল উপজাতি নয়, সকল বঞ্চিত মানুষকে সব ধরনের অবিচার ও শোষণ থেকে মুক্ত করা।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার সময় ঘোষণাপত্রেই বলা হয়েছিল এডিসি শুধু উপজাতিদের জন্য নয়,সকলের জন্য।
এডিসির ভৌগোলিক বিস্তার ও জনসংখ্যার চিত্র
এডিসির মোট আয়তন ৭,১৩২.৫৬ বর্গকিলোমিটার, যা ত্রিপুরার মোট আয়তনের প্রায় ৬৮ শতাংশ রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড। এডিসি এলাকার মোট জনসংখ্যা ১২,১৬,৪৬৫ জন, যার মধ্যে তফসিলি উপজাতি ৮৩.৪ শতাংশ। বাকি প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ অ-উপজাতি, সংখ্যায় প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি। এই নির্বাচনে মোট ৯.৬ লক্ষের বেশি ভোটার ১,২৫৭টি বুথে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।সেই লক্ষাধিক ভোটারের মধ্যে যে দুই লাখ অ-উপজাতি বাসিন্দা রয়েছেন, তাঁদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন উঠলেই শুরু হয় আসল সংকটের গল্প।
আসন বিন্যাসের ইতিহাস: কীভাবে কমল জেনারেল সিট?
প্রথম পর্যায় (১৯৮২)১৯৮২ সালে এডিসি প্রথম গঠিত হলে নির্বাচিত ২৮টি আসনের মধ্যে তফসিলি উপজাতিদের জন্য ২১টি আসন সংরক্ষিত ছিল এবং ৭টি আসন সাধারণ বা জেনারেল আসন হিসেবে অসংরক্ষিত ছিল যেখানে বাঙালিসহ যেকোনো বাসিন্দা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৮৪–১৯৮৫) ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তির পর পরিষদের কাঠামোতে বদল আসে। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের বিধান অনুযায়ী জেলা পরিষদের তিন-চতুর্থাংশ আসন তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত রাখার নীতিমালা গৃহীত হয়। তৃতীয় পর্যায় শান্তি চুক্তি পরবর্তীতে বিভিন্ন শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে একটি মেমোরান্ডাম অব সেটলমেন্টে তফসিলি উপজাতিদের আসন ২৫-এ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে ২৮টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ST সংরক্ষিত আসন বেড়ে ২৫টি হয় এবং সাধারণ বা জেনারেল আসন কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩টিতে।
একটু তুলনা করুন ৭টি থেকে ৩টি। জনসংখ্যা কমেনি, ভূখণ্ড কমেনি। কমেছে শুধু অ-উপজাতি বাসিন্দার রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর।
২০২৬ নির্বাচনের ফলাফল: নতুন ক্ষমতার সমীকরণ,১৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সমস্ত ২৮টি আসনের ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। তিপ্রা মথা পার্টি ২৪টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে এবং বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৪টি আসন। তিপ্রা মথার নেতৃত্বে প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মার এই বিজয়কে কেবল নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে নয়, ত্রিপুরার উপজাতি অঞ্চলে এই দলের প্রভাব আরও সুদৃঢ় হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই নির্বাচনে ২৮টি আসনের মধ্যে সমস্ত আসনই তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। অর্থাৎ এডিসি এলাকার প্রায় দুই লাখ অ-উপজাতি বাসিন্দার নিজস্ব কোনো প্রতিনিধি এই পরিষদে নেই থাকার উপায়ও নেই এই কাঠামোয়।
সংখ্যার হিসেব: প্রতিনিধিত্বের বৈষম্য কতটা গভীর?
একটি সহজ হিসেব দেখুন
এডিসি এলাকায় প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ অ-উপজাতি। গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী ৩০ সদস্যের পরিষদে তাদের প্রতিনিধিত্ব পাওয়া উচিত ছিল প্রায় ৫টি আসন।বাস্তবে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৩টি জেনারেল আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ এবং সেই আসনেও ST প্রার্থীরা লড়তে পারেন।
সংরক্ষিত ২৫টি ST আসনে কোনো বাঙালি বা অ-উপজাতি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগই পান না। ফলে কার্যত এডিসির শাসনকাঠামোতে লক্ষাধিক অ-উপজাতি বাসিন্দার কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত।
প্রশ্ন উঠছে ২০২৬ সালে তিপ্রা মথার ২৪ আসনের নিরঙ্কুশ জয়ের পর এই পরিষদে সেই দুই লাখ বাঙালির কথা কে বলবেন? কোন সদস্য বাজেট বৈঠকে দাবি তুলবেন দুর্গম গ্রামে বাঙালি পরিবারের জল-রাস্তা-বিদ্যুতের জন্য? কে লড়বেন ভূমি রেজিস্ট্রেশনের জটিলতায় দিশাহারা অ-উপজাতি কৃষকের পাশে?
ভূমি অধিকারের প্রশ্ন:এডিসি এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিরা তাঁদের পূর্বপুরুষের বসতভিটার উপর আইনি মালিকানা নিশ্চিত করতে পারছেন না। জমি রেজিস্ট্রেশনে বাধা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এগুলো দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। অথচ পরিষদে এই সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি নেই। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীনতা মাত্র ৩টি জেনারেল আসনে সীমাবদ্ধ থাকা মানে এডিসির বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, নিয়োগ নীতি ও আইন প্রণয়নে বাঙালি সম্প্রদায়ের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। আজ যে ২৪ জন তিপ্রা মথা সদস্য পরিষদে বসবেন, তাঁদের কাছে এডিসি এলাকার বাঙালিদের দাবি পৌঁছাবে কীভাবে?
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৈষম্য ত্রিপুরায় তফসিলি উপজাতিদের জন্য ৩১ শতাংশ সংরক্ষণ কঠোরভাবে পালিত হয়। দশকের পর দশক ধরে এডিসি এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিরা এই সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকছেন এডিসির অধীনে নিয়োগেও তারা উপেক্ষিত।২০২০ সালের জানুয়ারিতে ত্রিপুরা বিধানসভায় এডিসির আসন সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সেই প্রস্তাব পাসের পর ছয় বছর কেটে গেছে ২০২৬ সালের নির্বাচনও হয়ে গেল সেই একই পুরনো ২৮ আসনে। জেনারেল আসনের অনুপাত বাড়বে কিনা তা নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।
প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, নির্বাচন আসে, ভোট পড়ে কিন্তু বাঙালির বঞ্চনার সেই চিত্র একটুও বদলায় না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ন্যায্যতার দাবি ও বাস্তবতার ফাঁক
ত্রিপুরায় উপজাতি জনগোষ্ঠীর অনুপাত ১৯৪১ সালে ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ, যা ২০১১ সালের জনগণনায় নেমে এসেছে মাত্র ৩১ শতাংশে। ১৯৪৭-পরবর্তী অভিবাসনের ফলে ঘটে যাওয়া এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে উপজাতি অধিকার সংরক্ষণের যুক্তি অবশ্যই বৈধ। সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আজকের এডিসি এলাকার লক্ষাধিক বাঙালি নাগরিক যাঁরা এই মাটিতেই জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, সন্তান মানুষ করেছেন তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পদদলিত হতে থাকবে।
এডিসি এলাকায় বসবাসকারী অ-উপজাতি সম্প্রদায়ের দাবিগুলো চরমপন্থী নয়, মৌলিক
প্রথমত, পূর্ববর্তী ৭টি জেনারেল আসন পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক, যাতে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, দশকের পর দশক বসবাসকারী অ-উপজাতি পরিবারগুলোর জমির মালিকানা ও বসতির আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত,শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সরকারি সুযোগ-সুবিধায় এডিসি এলাকার সকল বাসিন্দার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত,এডিসির প্রশাসনিক স্তরে অ-উপজাতি সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থানে ন্যায্য অংশীদারিত্ব দিতে হবে।
তিপ্রা মথার ২৪ আসনের এই নিরঙ্কুশ জয় পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আরও একচেটিয়া করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে পরিষদের ৩০ সদস্যের মধ্যে অ-উপজাতির কণ্ঠস্বর যদি থাকে মাত্র ৩ জনের হাতে, তাহলে সেই কণ্ঠস্বর কি আদৌ শোনা যাবে?
এডিসি প্রতিষ্ঠার সময় বলা হয়েছিল এটি হবে "উপজাতি ও অ-উপজাতি মানুষের ঐক্যের প্রতীক।" আজ সেই পরিষদেই অ-উপজাতি দুই লাখ মানুষের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলেন না। এই ফলাফল কি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ত্রিপুরার পাহাড়ে যতদিন উপজাতি ও বাঙালি একসঙ্গে বাস করবেন, ততদিন উভয়ের সম-মর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই সত্য উপলব্ধি করতেই হবে — কারণ একটি পক্ষকে বঞ্চিত রেখে গড়া উন্নয়নের ভিত কখনো টেকসই হয় না।

0 মন্তব্যসমূহ