গন্ডাছড়া সড়ক দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াত এসপিও জওয়ানের পাশে সহকর্মীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের হাতে তুলে দিলেন আর্থিক সহায়তা

গন্ডাছড়া সড়ক দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াত এসপিও জওয়ানের পাশে সহকর্মীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের হাতে তুলে দিলেন আর্থিক সহায়তা।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ। নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে গন্ডাছড়া থানায় ফেরার পথে বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান ধলাই জেলার গন্ডাছড়া মহকুমার রথপাড়ার বাসিন্দা, দীর্ঘ ২০ বছরের কর্তব্যনিষ্ঠ এসপিও জওয়ান অজেন্দ্র ত্রিপুরা। সরকারের হয়ে ডিউটি করতে গিয়ে প্রাণ দিলেন তিনি। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর সরকার যা করেনি, তা করলেন তাঁরই সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে কিছু আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দিলেন শোকসন্তপ্ত পরিবারের হাতে।

এই মর্মান্তিক সহমর্মিতার দৃশ্যে উপস্থিত ছিলেন এসপিও সংগঠনের নেতৃত্বে অবনি শীল, ইন্দ্র মনি, দীপঙ্কর দাস, হীরা মোহন দেবনাথ সহ বহু সহকর্মী।

মৃত এসপিও জওয়ানের স্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে জানান২০ বছর সরকারের অধীনে কাজ করার পরও স্বামীর মৃত্যুর পরে পরিবারকে ন্যূনতম নিরাপত্তা বা সহায়তা দেয়নি সরকার। চারজনের সংসার চালাতে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।এটা কি মেনে নেওয়া যায়? সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাঁর মৃত্যু হয়, তাঁর পরিবারের কান্না মোছার দায়িত্ব কি সহকর্মীদের চাঁদার উপর ছেড়ে দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ?এসপিও সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩৭ জন এসপিওবিভিন্ন কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ পরিবারের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ায়নি কোনো সরকারইনা বামেরা, না বিজেপি।ত্রিপুরার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর, থানা থেকে আউট পোস্ট, নির্বাচন থেকে দাঙ্গা পরিস্থিতি, রাতের টহল থেকে অপরাধী ধরার অভিযান—সব জায়গাতেই পুলিশের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছেন এই এসপিও জওয়ানরা।কিন্তু তাঁদের জীবনের বাস্তব ছবি আরও অন্ধকার।বর্তমানে একজন এসপিওকে শুধু থানার দায়িত্ব নয়, অনেক ক্ষেত্রে অফিসারদের বাড়ির কাজ, কাপড় কাচা, রান্নাবান্না, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও ফিরিয়ে আনা পর্যন্ত করতে হয়। আর মাস শেষে হাতে আসে মাত্র প্রায় ১২ হাজার টাকার সামান্য ভাতা যা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব।অন্যদিকে মন্ত্রী-নেতাদের গাড়ির তেলের খরচ, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার পিছনে প্রতি মাসে ব্যয় হয় হাজার হাজার টাকা। যাঁরা বাস্তবে মাটিতে নেমে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ আজও অন্ধকারে।

২০১৮ সালে সরকার পরিবর্তনের সময় রাজ্যের হাজার হাজার এসপিও পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল। নির্বাচনী মঞ্চ থেকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলএসপিওদের নিয়মিত করা হবে, বেতন বৃদ্ধি করা হবে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।কিন্তু আট বছর পরেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন সব সরকারই এসপিওদের ব্যবহার করেছে ভোট ও প্রশাসনিক স্বার্থে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের দাবি ও সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে উপেক্ষিত হয়েছে।যে বাহিনী ছাড়া বর্তমানে অনেক থানা ও আউট পোস্ট পরিচালনা কার্যত অসম্ভব, সেই বাহিনীর কর্মীদের কেন এখনও স্থায়ী মর্যাদা, নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, বীমা, পেনশন ও মৃত্যুকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না?তাঁরা শুধু অস্থায়ী কর্মী নন তাঁরাও কারও বাবা, স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষ।যদি সত্যিই সুশাসন ও ডাবল ইঞ্জিন উন্নয়ন বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে প্রথমে মাটিতে কাজ করা এই এসপিওদের ন্যায্য অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

নইলে প্রতিশ্রুতি শুধু রাজনৈতিক ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে আর বাস্তবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতে থাকবে হাজার হাজার এসপিও পরিবার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ