রেলপথে অবৈধ সুপারি আটককে ঘিরে চুরাইবাড়িতে ‘নাটক’: ঘুষের বিনিময়ে ছাড়া পেল ধৃতরা, প্রশ্নের মুখে বিতর্কিত দারোগা প্রদীপ বর্মন।
চুরাইবাড়ি, ২৩ জানুয়ারি:
রেলপথে অবৈধভাবে সুপারি পাচারের অভিযোগে চুরাইবাড়ি থানার এক বিতর্কিত দারোগার ভূমিকা নিয়ে ফের চাঞ্চল্য ছড়াল উত্তর ত্রিপুরায়। অভিযোগ, অবৈধ সুপারি আটকের নামে এক প্রহসনমূলক নাটক মঞ্চস্থ করে শেষ পর্যন্ত কুড়ি হাজার টাকার বিনিময়ে ধৃত দুই যুবককে ছেড়ে দেন চুরাইবাড়ি থানার এসআই প্রদীপ বর্মন, যিনি ইতিমধ্যেই ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে বহুবার সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছেন।
ঘটনাটি ঘটে গতকাল, বৃহস্পতিবার বিকেলে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, করিমগঞ্জ থেকে আগরতলাগামী একটি ডেমো ট্রেনে করে নিলামবাজার এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ সুপারি তেলিয়ামুড়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সুপারিগুলোর কোনও বৈধ নথিপত্র ছিল না। এমন খবর পেয়ে চুরাইবাড়ি থানার পক্ষ থেকে তৎপরতা দেখানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, থানার ‘তুল্লা ভান্ডারের ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত এসআই প্রদীপ বর্মন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ট্রেন থেকে মাত্র দশ বস্তা সুপারি আটক করেন। এখান থেকেই শুরু হয় নাটকের প্রথম অঙ্ক। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সাংবাদিকদের উপস্থিতির আগে তিনি দশ হাজার টাকার বিনিময়ে সুপারি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে সংবাদকর্মীরা উপস্থিত থাকায় সেই চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে সুপারি গুলো চুরাইবাড়ি থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও অভিযোগ, সেখানেও অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির চাপে সুপারি গুলো সিজ করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এসআই প্রদীপ বর্মন জানান, সুপারি সহ আটক দুই ব্যক্তিকে পরদিন আদালতে পাঠানো হবে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ধৃতরা সুপারির মালিক নন এবং ‘সন্দেহজনকভাবে’ তাদের আটক করা হয়েছে। এমনকি তিনি বলেন, গোটা বিষয়টি মহকুমা পুলিশ আধিকারিক জয়ন্ত কর্মকার ও রেলের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদেরও জানানো হয়েছে এবং তিনি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই কাজ করবেন।
তবে এসআই প্রদীপ বর্মনের এই বক্তব্যকে কার্যত ভুয়ো প্রমাণ করে ধৃত দুই যুবক—শাজাহান আহমেদ ও মাছুম আহমেদ। তারা স্পষ্টভাবে জানান, সুপারির প্রকৃত মালিক তারাই এবং সেগুলো নিয়ে তেলিয়ামুড়ার উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিলেন। অভিযোগ, রাতে কুড়ি হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, কয়েক দিনের মধ্যে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সিজ করা সুপারি গুলিও ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য চুরাইবাড়ি থানাকে কার্যত ‘বিক্রি’ করে দিচ্ছেন এই দারোগা। উল্লেখযোগ্যভাবে, কিছুদিন আগেই ত্রিপুরা থেকে বহিঃরাজ্যে গাঁজা পাচার সংক্রান্ত মামলায় নাম জড়ানোয় জেলা পুলিশ সুপার অবিনাশ রাই তাকে বদলি করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বদলির নির্দেশ কার্যত অমান্য করে তিনি এখনও চুরাইবাড়িতেই বহাল রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, এসআই প্রদীপ বর্মন প্রকাশ্যেই বলে বেড়ান—চুরাইবাড়ি থেকে বদলি হলেই তিনি শান্তি পাবেন, কারণ এখানে নাকি তার ‘প্রচুর বদনাম’। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, বদলির নির্দেশ থাকার পরেও তিনি কেন এখনও চুরাইবাড়ি ছাড়ছেন না?
এলাকায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, প্রদীপ বর্মনের নাম একাধিক নেশা সাম্রাজ্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এই পরিস্থিতিতে চুরাইবাড়ির সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, অবিলম্বে যদি এমন ঘুষখোর ও বিতর্কিত অফিসারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনে চুরাইবাড়ি আরও বড় অপরাধ ও নেশা চক্রের আখড়ায় পরিণত হবে।
এখন দেখার বিষয়, জেলা পুলিশ প্রশাসন—বিশেষ করে পুলিশ সুপার অবিনাশ রাই—এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।


0 মন্তব্যসমূহ