কেমন আছে পাহাড়? উন্নয়ন হয়েছে বলছে সরকার — তাহলে জলের জন্য রাস্তা অবরোধ কেন, ভোট বয়কটের ডাক কেন?

কেমন আছে পাহাড়? উন্নয়ন হয়েছে বলছে সরকার — তাহলে জলের জন্য রাস্তা অবরোধ কেন, ভোট বয়কটের ডাক কেন?

আগরতলা, ১৭ মার্চ।

সামনে এডিসি নির্বাচন। ফের সাজছে মঞ্চ, ফের জ্বলছে আলো, ফের ভেসে আসছে প্রতিশ্রুতির সুর। কেউ বলছেন "সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিন", কেউ বলছেন "উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ভোট দিন।" কিন্তু ধলাই জেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে যে আদিবাসী মা আজও মাথার উপর পাকা ছাদ পাননি, কলসি কাঁখে মাইলের পর মাইল হেঁটে জল আনছেন — তাঁর কাছে এই কথাগুলো নতুন নয়। প্রতিটি নির্বাচনে তিনি এই একই কথা শুনেছেন। এবারও শুনছেন।


আর একটি কথা বলার আছে। সেই পাহাড়ি গ্রামের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছানোও সহজ নয়। কারণ সেখানে পৌঁছানোই সাংবাদিকের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ভাঙা রাস্তা, নেই সেতু, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক — পাহাড়ের বহু এলাকায় সংবাদ প্রতিনিধিদের পৌঁছানো আজও রীতিমতো দুঃসাধ্য। যে এলাকায় সাংবাদিক পৌঁছাতে পারেন না, সেখানকার মানুষের কষ্টের কথা কে বলবে? কোন মঞ্চ থেকে শোনা যাবে সেই নীরব কান্না? রাস্তা না থাকলে সাংবাদিক পৌঁছান না, সাংবাদিক না পৌঁছালে খবর হয় না, খবর না হলে সমস্যা থাকে অদৃশ্য — আর সমস্যা অদৃশ্য থাকলে নেতারা বলতে পারেন "সব ঠিক আছে।" এই চক্রটাই পাহাড়ের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। বিজেপি-তিপ্রা মথা-আইপিএফটি জোট সরকার বলছে জনজাতিদের উন্নয়ন হয়েছে। এডিসিতে ক্ষমতাসীন তিপ্রা মথাও বলছে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম খুললেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ছবি — জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় পানীয় জলের দাবিতে রাস্তা অবরোধ হচ্ছে, এডিসি ভোট বয়কটের ডাক উঠছে। এই দুটি ঘটনা যদি একসঙ্গে সত্যি হয়, তাহলে "উন্নয়ন হয়েছে" দাবিটি কতটা ফাঁকা — সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।


জল জীবন মিশনে কেন্দ্র থেকে কোটি কোটি টাকা এসেছে। প্রতিটি ঘরে নলবাহিত জল পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাহলে ২০২৬ সালে এসেও পাহাড়ের মানুষকে জলের জন্য রাস্তা বন্ধ করতে হচ্ছে কেন? সেই টাকা গেল কোথায়? কাজ হলো কতটুকু? কোন ঠিকাদারের পকেটে গেল জনজাতির হকের অর্থ? এই প্রশ্নের সদুত্তর না দিয়ে শুধু "উন্নয়ন হয়েছে" বললে জনতা আর বিশ্বাস করবে না।


**ভোট বয়কট — ষড়যন্ত্র নয়, বঞ্চনার চিৎকার**


যে মানুষ বারবার ভোট দিয়েছেন এবং বারবার প্রতারিত হয়েছেন, তিনি যখন ভোট বয়কটের কথা বলেন — সেটা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়, সেটা দীর্ঘ বঞ্চনার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। ২৫ বছরের বাম শাসনে পাহাড়ের জনজাতির প্রকৃত ভাগ্য বদলায়নি — এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেই ব্যর্থতার দোহাই দিয়ে বর্তমান জোট সরকার আর কতদিন পার পাবে?


সাত বছরে কতটি টং ঘর পাকা হয়েছে? কতটি গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছেছে? কতটি পাহাড়ি গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে? কতজন তরুণ কর্মসংস্থান পেয়েছেন? রেশন কার্ড, জব কার্ড — এই মৌলিক অধিকারগুলো থেকে আজও কত পরিবার বঞ্চিত? সংখ্যা দিন। হিসাব দিন।


**দোষারোপের চক্র — আর কতদিন?**


এডিসি প্রশাসন বলছে রাজ্য সরকারের সহযোগিতা নেই। রাজ্য সরকার বলছে এডিসি দায়িত্ব পালন করছে না। বিজেপি বলছে বাম আমলের ক্ষত শুকায়নি। তিপ্রা মথা বলছে কেন্দ্র প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এই দোষারোপের চক্রে পিষ্ট হচ্ছেন পাহাড়ের সেই মানুষ, যিনি আজও টং ঘরে বসে অপেক্ষা করছেন — কখন আসবে ঘর, কখন আসবে বিদ্যুৎ, কখন আসবে পানীয় জল, কখন পাবেন ছেলেমেয়ের জন্য একটি ভালো স্কুল।


প্রতিটি দল যখন অন্যকে দোষ দেয়, তখন একটাই প্রশ্ন ওঠে — ক্ষমতায় থেকেও যদি কিছু না করা যায়, তাহলে ক্ষমতা চাইছেন কীসের জন্য?


**যেখানে সাংবাদিক পৌঁছান না, সেখানে অন্ধকার থাকে**


পাহাড়ের বহু গ্রামের সমস্যা আজও জাতীয় বা রাজ্যস্তরের মনোযোগ পায় না — কারণ সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা নেই, যোগাযোগ নেই, নেটওয়ার্ক নেই। যে সমস্যার খবর হয় না, সেই সমস্যার সমাধানও হয় না। আর এই অদৃশ্যতাকেই রাজনৈতিক নেতারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে রাস্তা না বানানোটা তাই শুধু পরিকাঠামোর ব্যর্থতা নয় — এটা ইচ্ছাকৃত অন্ধকারে রাখার রাজনীতিও বটে।


**পাহাড় জবাব চায়**


প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মা বলছেন "সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিন।" রাজ্যের বিজেপি নেতারা বলছেন "উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভোট দিন।" পাহাড়ের মানুষের একটাই পাল্টা প্রশ্ন — কোন ভবিষ্যতের কথা বলছেন? যে ভবিষ্যতে আজও জলের জন্য রাস্তা বন্ধ করতে হয়? যে ভবিষ্যতে টং ঘরে রাত কাটাতে হয়? যে ভবিষ্যতে কাজ নেই, রেশন নেই, পাকা রাস্তা নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই?


২৫ বছর বাম আমল, তারপর ৭ বছরের বেশি বর্তমান জোট শাসন — পাহাড়ের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন। এবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, পাহাড় চাইছে প্রমাণ। পাহাড় চাইছে জবাবদিহি। পাহাড় চাইছে সত্যিকারের উন্নয়ন — মঞ্চের ভাষণে নয়, ঘরে ঘরে, গ্রামে গ্রামে, পথে পথে।


পাহাড় আজ একটাই কথা বলছে — যথেষ্ট হয়েছে। এবার জবাব দিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ