ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, আগে বর্তমানের জবাব দিন ভগীরথ পাড়ার টং ঘরে ছয় বছর, এটা কার ব্যর্থতা

 ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, আগে বর্তমানের জবাব দিন ভগীরথ পাড়ার টং ঘরে ছয় বছর, এটা কার ব্যর্থতা

সামনে এডিসি নির্বাচন । প্রচারের মঞ্চ সাজছে, মাইক ফাটছে, ভিড় জমছে। তিপ্রা মথার সর্বোচ্চ নেতা তথা মহারাজা প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মা জনসমাবেশের পর জনসমাবেশে একটাই বার্তা দিয়ে চলেছেন — "আপনার ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাদের ভোট দিন।" অন্যদিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারও উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে জনজাতি ভোটারদের দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু গন্ডাছড়া মহকুমার সীমান্তবর্তী ভগীরথ পাড়ায় পৌঁছালে এই দুই শিবিরের সব দাবি ও প্রতিশ্রুতি ফাঁকা বুলি বলে মনে হয়। কারণ সেখানে বর্তমানটুকুই এখনও নিশ্চিত হয়নি। ছয় বছর ধরে টং ঘরে বসবাস করছেন রতি মোহন ত্রিপুরা ও তাঁর পরিবার। মাথার উপর পাকা ছাদ নেই। হাতে রেশন কার্ড নেই। জব কার্ড নেই। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত এই পরিবার। দুই মুঠো অন্নের জন্য প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের মুখে ঠিকমতো খাবার তুলে দেওয়ার সামর্থ্যটুকুও নেই।

প্রশ্নটা তাই সরাসরি করা দরকার — এটা কার ব্যর্থতা? এখানে দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই। এডিসি-তে ক্ষমতায় তিপ্রা মথা, রাজ্যে ক্ষমতায় বিজেপি — এবং দুই দল মিলে জোট সরকার চালাচ্ছে। অর্থাৎ এডিসি প্রশাসন ও রাজ্য সরকার — উভয়ই একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে। জনজাতি অঞ্চলে আবাস যোজনার সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের, রেশন কার্ড ও জব কার্ড বিতরণের দায়িত্বও প্রশাসনের। অথচ ভগীরথ পাড়ার রতি মোহন ত্রিপুরার পরিবার ছয় বছর ধরে এই সমস্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাহলে ব্যর্থতাটা কি শুধু এডিসি-র, নাকি রাজ্য সরকারেরও সমান ভাগ রয়েছে? এডিসি প্রশাসনের অধীনে জনজাতি অঞ্চলে কোন প্রকল্প মাঠে বাস্তবায়িত হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রদ্যুৎ বাবুর জনসভায় শোনা যায় না। আবার রাজ্য বিজেপি সরকারও জনজাতি অঞ্চলের পানীয় জল, রাস্তাঘাট, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় বলে দাবি কিন্তু বাস্তব অন্য রকম। দুই পক্ষই ভোটের মুখে উন্নয়নের গল্প শোনায়, কিন্তু পাহাড়ের জনজাতি অঞ্চলগুলো বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় জর্জরিত থাকে।যে বাবা-মা আজ নিজেরাই স্বাবলম্বী নন, তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়বেন? মা-বাবা যদি দুই বেলা খেতে না পান, মাথার উপর পাকা ছাদ না থাকে, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা না পান কাজ নেই  — তাহলে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে কোন জাদুবলে? আগে বর্তমান, তারপর ভবিষ্যৎ — এই সহজ সত্যটা কি ক্ষমতায় থাকা নেতারা বোঝেন না, নাকি বুঝতে চান না? রতি মোহন ত্রিপুরার পরিবার কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। ধলাই জেলার পাহাড়ি জনজাতি অঞ্চল জুড়ে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, পানীয় জলের তীব্র সংকট এবং কর্মহীনতা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এডিসি ও রাজ্য — দুই প্রশাসনের আওতায় থেকেও এই মানুষগুলো আজ সরকারি সুবিধার বাইরে। নির্বাচনের আগে ভগীরথ পাড়ার এই করুণ ছবি রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। জনজাতি মানুষ এবার পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাইছেন — শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে ভোট মিলবে না। তিপ্রা মথা হোক বা বিজেপি জোট সরকার — ছয় বছর ধরে টং ঘরে বসবাস করা রতি মোহনের পরিবারের কাছে আগে জবাব দিতে হবে। সেই জবাব দেওয়ার সামর্থ্য আছে কি কারও?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ