প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাসে আঁকা এক অপূর্ব ছবি—খাওরাবিল।

প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাসে আঁকা এক অপূর্ব ছবি—খাওরাবিল। 

প্রতিনিধি অনুপম পাল। কৈলাসহর

পর্যটন মানুষের জীবনের এক অনিবার্য অংশ। ব্যস্ততা আর একঘেয়েমিতে ভরা আধুনিক জীবনে যখন মানুষ প্রতিদিনের ক্লান্তি ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটায়, তখন প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পাহাড়, নদী, অরণ্য আর খোলা আকাশের নিচে কিছুটা সময় কাটিয়ে মানুষ আবার নতুন উদ্যমে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে চায়। আর ঠিক এমনই এক অপার সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হয়ে রয়েছে ঊনকোটি জেলার ঐতিহাসিক শহর কৈলাসহরের কাছাকাছি অবস্থিত খাওরাবিল।ত্রিপুরা আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলই পাহাড়-পর্বতে ঘেরা, নদী-নালা আর সবুজ অরণ্যে ভরা। ফলে পর্যটনের সম্ভাবনাও এখানে অপরিসীম। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সরকারিভাবে বা বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলেও কৈলাসহর থেকে খুব কাছেই অবস্থিত খাওরাবিল এখনও তেমনভাবে পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এই জলাভূমি একদিন হয়ে উঠতে পারে রাজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।ঐতিহাসিক দিক থেকেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তম শতাব্দী থেকেই ত্রিপুরার রাজারা উত্তর ত্রিপুরার এই অঞ্চল থেকে রাজ্য শাসন করতেন। সেই সময় রাঙাউটি এলাকায় গড়ে উঠেছিল রাজন্য আমলের রাজধানী। আজও সেই ইতিহাসের কিছু নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। রাঙাউটি এলাকায় একসময় অস্থায়ী রাজবাড়ি নির্মাণ করে অবস্থান করতেন মহারাজা ইন্দ্র মানিক্য। এখনও সেখানে রয়েছে বিশাল আকারের রাজার দীঘি, যা অতীত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এই ঐতিহাসিক পরিবেশের মাঝেই প্রায় ২০০ কানি জমি জুড়ে গড়ে উঠেছে খাওরাবিলের বৃহৎ মৎস্য চাষ কেন্দ্র। কৈলাসহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মাছের যোগান আসে এখান থেকেই। ২০০০ সালে তৎকালীন টিসিএস অফিসার শ্যামলিমা ব্যানার্জির উদ্যোগে ৭০টি পরিবারকে নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয় এবং ২০০২ সালে এই মৎস্য প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই কেন্দ্র শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।


খাওরাবিলের চারপাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর তার মাঝখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ—এই দৃশ্য যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাসে আঁকা এক অপূর্ব ছবি। শীতকালে অনেকেই নৌকায় করে এই দ্বীপে এসে বনভোজন করেন। খোলা আকাশ, শান্ত পরিবেশ আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মানুষকে মুগ্ধ করে তোলে মুহূর্তেই। অনেক দর্শনার্থী এই অপরূপ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরেন। তবুও উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে এখানে আসা পর্যটকদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।


সমিতির ম্যানেজার দুর্লভ নমঃ জানান, সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেই দ্বীপের মধ্যে একটি পাকা ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে, যদিও আর্থিক সংকটের কারণে কাজ এখনও সম্পূর্ণ করা যায়নি। পাশাপাশি একটি রান্নাঘর, ফুলের বাগান এবং হাওয়া ঘর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা যায়।একসময় তৎকালীন উপমুখ্যমন্ত্রী বৈদ্যনাথ মজুমদার রাজ্যে জল উৎসবের ঘোষণা করেছিলেন এবং সেই তালিকায় নীরমহলের পাশাপাশি স্থান পেয়েছিল খাওরাবিলও। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ২০১৮ সালের পর থেকে আর সেই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে খাওরাবিলের সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে।অন্যদিকে, এক সময় ঊনকোটি জেলার জেলা শাসক ডাঃ বিশাল কুমার এই জায়গাটির সম্ভাবনা উপলব্ধি করে দ্বীপের মধ্যে পর্যটকদের জন্য আধুনিক ছোট ছোট ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর বদলির পর সেই উদ্যোগ আর এগিয়ে যায়নি।


আজও তাই খাওরাবিল দাঁড়িয়ে আছে নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নিয়েই—খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির অপরূপ যৌবন নিয়ে। সামান্য পরিকল্পনা, কিছু সরকারি উদ্যোগ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলেই এই জায়গাটি হয়ে উঠতে পারে ত্রিপুরার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। এতে যেমন পর্যটনের বিকাশ ঘটবে, তেমনি এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্তও খুলে যাবে।


প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ প্রকৃতি আর ইতিহাসের স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে খাওরাবিল যেন এক সম্ভাবনার প্রতীক। এখন শুধু অপেক্ষা, কবে পড়বে সরকারের দৃষ্টি এবং কবে নতুন সাজে সেজে উঠবে এই অপূর্ব প্রাকৃতিক সম্পদ।খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই নীরব সৌন্দর্য যেন আজও আহ্বান জানায়—“একটু আন্তরিকতা পেলেই আমি হয়ে উঠতে পারি পর্যটকদের স্বপ্নের ঠিকানা।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ