ঊনকোটিই কি স্বামীনারায়ণ শাস্ত্রে উল্লিখিত ‘নবলাখো পর্বত’?
প্রতিনিধি অনুপম পাল,কৈলাসহর
নীলকণ্ঠ বর্ণী মহারাজ (ভগবান স্বামীনারায়ণ) কি শৈব তীর্থক্ষেত্র ঊনকোটিতে আগমন করেছিলেন? হ্যাঁ, আধ্যাত্মিক রেকর্ড ও সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ১১ বছর বয়সে ভারতব্যাপী তীর্থযাত্রাকালে তিনি ঊনকোটি পরিদর্শন করেন এবং তিন দিন অবস্থান করেন বলে জানা যায়। ঐ সময়ে তিনি ন’ লক্ষ যোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ও তাঁদের মোক্ষের পথ প্রদর্শন করেন বলে জানা যায়।
আক্ষরধাম, গান্ধীনগরের আর্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. (প্রফেসর) স্বামী শ্রুতিপ্রকাশ দাস এক ভিডিও বার্তায় গবেষণার কাজ সম্পন্ন করার পর নিশ্চিত করেন যে, স্বামীনারায়ণ শাস্ত্রে উল্লিখিত রহস্যময় “নবলাখো পর্বত”-ই আসলে ঊনকোটি পর্বত। স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, (বিক্রমাব্দ)১৮৫৩ সালে শুক্রবার দিন পৌষ পূর্ণিমার সময় ভগবান স্বামীনারায়ণ এই স্থানে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন।
‘সৎজীবনী’ নামক গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, স্বামীনারায়ণ “নবলাখো পর্বত”-এ গিয়েছিলেন, যেখানে নয় লক্ষ দেব-দেবীর সমাবেশ ঘটেছিল। ইতিহাসে “নবলাখো পর্বত”-এর অবস্থান কোথাও উল্লেখ নেই, তাই অনুসারীদের দৃঢ় বিশ্বাস—ঊনকোটি-ই সেই নবলাখো পর্বত।এই বিশ্বাসের অন্যতম কারণ, বিশ্বের অন্য কোনও তীর্থক্ষেত্রে এত বিপুল সংখ্যক দেব-দেবীর মূর্তি একসঙ্গে দেখা যায় না।
উল্লেখযোগ্য যে, (প্রফেসর)স্বামীনারায়ণ ও ঊনকোটি পর্বতের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক খুঁজে বের করতে দুটি দল সম্প্রতি এখানে সফর করে।২০২৫ সালের জুলাই মাসে সন্যাসী মুক্তিপ্রিয় দাসের নেতৃত্বে একটি আধ্যাত্মিক দল ঊনকোটিতে সফর করেন। প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পর, ৩০ সেপ্টেম্বর ড. (প্রফেসর) স্বামী শ্রুতিপ্রকাশ দাসের নেতৃত্বে লন্ডন থেকে আগত এক গবেষণা দলের সঙ্গে পুনরায় ঊনকোটি পরিদর্শন করেন । উভয় দলকেই জেলা প্রশাসনের নির্দেশে দিকনির্দেশনা করান কৈলাসহর প্রেস ক্লাবের বরিষ্ঠ সদস্য তথা পরিবেশবিদ ও লেখক মৃণাল কান্তি সিনহা।
তবে, বিএপিএস (বোচাসনওয়াসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা)-র এই গবেষণা যে ঊনকোটিকে নবলাখো পর্বত হিসেবে শনাক্ত করেছে, তা এই স্থানের এক নতুন আধ্যাত্মিক মাত্রা যোগ করেছে।
এই আবিষ্কার ঊনকোটির ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।ত্রিপুরার এই শৈব তীর্থক্ষেত্র ঊনকোটি, যার ভাষ্কর্য ও পাথরখোদাই মূর্তিগুলো দর্শনার্থীদের মোহিত করে, আজও ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদের কাছে এক রহস্য। প্রতিবছর অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহী ও তীর্থযাত্রী এখানে আসেন, কিন্তু তাঁরা ফিরে যান এই শিল্প কর্মগুলোর উৎপত্তি কবে,কিভাবে,কার হাতে হয়েছিলো এধরনের অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে? রহস্যময় ঊনকোটি নিয়ে নানান বিপরীত মতবাদ ও কিংবদন্তি সামনে এসেছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনও একক স্বীকৃত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি যে, এই বিস্ময়কর শিল্পকর্মগুলি কীভাবে এত অজ ও দুর্গম অঞ্চলে সৃষ্টি হলো, যা কোনো প্রাচীন বাণিজ্য বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) অনুসারে ঊনকোটির ভাষ্কর্য ও শিল্পকলা খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর । প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. নীহার রঞ্জন রায় ঊনকোটির সঙ্গে পাল রাজবংশের প্রভাব লক্ষ্য করেছেন, এবং এতে বৌদ্ধ প্রভাব বিদ্যমান।অন্য এক মতানুসারে, ঊনকোটির সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ৮৪৯ সালেও হতে পারে।খ্রিস্টপূর্ব ৮৪৯ সালে বর্তমান মায়ানমারের মিয়ামরা গোষ্ঠী মন-খেমার অধ্যুষিত অঞ্চলে আক্রমণ চালায়। আক্রমণের ফলে একদল দক্ষিণ এশিয়ায় পালিয়ে আসে, এবং মন জাতিগোষ্ঠীর একাংশ আশ্রয় নেয় ঊনকোটি অঞ্চলে।এই মন-খেমার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্রাবিড় শিল্পীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যারা ছিলেন শিবভক্ত।বেশ কিছু বছর আগে মন-উৎপত্তি খাসি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী ঊনকোটি পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে।ঊনকোটির ভাষ্কর্য মূর্তির সঙ্গে কম্বোডিয়ার অংকরওয়াত ও বায়ন মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর মিল এই তত্ত্বকে সমর্থন করে।একটি লোকগাঁথা অনুসারে, যেসব শিল্পী এই শিলাচিত্রগুলো নির্মাণ করেছিলেন, তাঁরা বাস করতেন বেলজউ-খুম নামের এক গ্রামে—যার অর্থ ‘শিল্পীদের গ্রাম’।বর্তমানে সেই গ্রামের নাম পরিবর্তিত হয়ে বেলকুমবাড়ী হয়েছে।
সম্প্রতি এই গ্রাম থেকেই অগ্নিদেবের একটি মূর্তি উদ্ধার হয়েছে, যা স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত পুরনো লোকগাঁথার কাহিনির সত্যতা প্রমাণ করে।
দুঃখজনকভাবে, ঊনকোটি বহু ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এর মধ্যে ১৮৯৬-৯৭ সালের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।
এছাড়া, ১৬শ শতকে “কালাপাহাড়” বহু শিলামূর্তি ধ্বংস করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে।তবে লেখক পন্নালাল রায় জানান, “কালাপাহাড়ের ত্রিপুরায় আগমনের কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই,” যদিও “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত”-এ এই ঘটনার উল্লেখ আছে।একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, একবার ভগবান শিব বহু দেব-দেবীকে নিয়ে বারাণসীর পথে রওনা দেন। পথে ক্লান্ত হয়ে তাঁরা বিশ্রাম নেন। শিব বলেছিলেন, “ভোরের আগে সবাইকে জাগতে হবে।” কিন্তু পরদিন ভোরে শুধু শিব জেগে ওঠেন, বাকিরা ঘুমন্ত অবস্থাতেই পাথরে পরিণত হন।
অসংখ্য কিংবদন্তি, নিদর্শন ও গবেষণার পরও ঊনকোটি আজও তার রহস্য আগলে রেখেছে—নিঃশব্দে, কিন্তু শক্তিশালীভাবে, যেন সময়ের বুকে খোদাই করা এক জীবন্ত ইতিহাস।এখন প্রয়োজন প্রচলিত লোকগাঁথা, সঠিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও নতুনভাবে গবেষণার, যা লোকগাঁথা এবং পিলাক ও ভুবনপাহাড় (অসম)-এর অনুরূপ শৈলীর ভাস্কর্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে করা যেতে পারে।
যদি ঊনকোটিকে ‘নবলাখো পর্বত’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এখানে স্বামীনারায়ণ মন্দির স্থাপনের মাধ্যমে এই পবিত্র ভূমিতে এক দেবীয় ও সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হবে।

0 মন্তব্যসমূহ