৬৬ বছরে রাজধানীর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ত্রিপুরার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা!

 ৬৬ বছরে রাজধানীর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ত্রিপুরার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা!

প্রতিনিধি অনুপম পাল, কৈলাসহর

ত্রিপুরার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত জি.বি.পি হাসপাতাল, একসময় রাজ্যের স্বাস্থ্যসেবার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ৬৬ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে প্রশ্ন উঠেছে—রাজধানীর বাইরে রাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা কতটা শক্তিশালী হয়েছে? আগরতলার জিবি হাসপাতাল যতই উন্নত হোক না কেন, জেলা ও গ্রামীণ ত্রিপুরা এখনও বঞ্চিত আধুনিক চিকিৎসা থেকে।


১৯৬১ সালের ১৪ই অক্টোবর তৎকালীন মহারাজা কিরীট বিক্রম মানিক্য বাহাদুর দানকৃত ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় জিবি হাসপাতাল। উত্তর প্রদেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থের নামে নামাঙ্কিত এই হাসপাতালটি শুরু হয়েছিল মাত্র ৮০ শয্যা নিয়ে।

সময় গড়াতে গড়াতে এটি আজ ১৪৩০ শয্যা বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল হাব-এ পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালে এখানেই যুক্ত হয় আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ (AGMC), যা ত্রিপুরার চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন অধ্যায় রচনা করে।


বর্তমানে জিবি হাসপাতালে রয়েছে একাধিক সুপার স্পেশালিটি বিভাগ, যেমন—নিউরো সার্জারি,কার্ডিওলজি,ইউরোলজি,অনকোলজি,ট্রমা কেয়ার ইউনিট। 


রাজ্য সরকার সম্প্রতি শুরু করেছে নতুন মাতৃ ও শিশু সুপার স্পেশালিটি ব্লক নির্মাণের কাজ, যার জন্য বরাদ্দ হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৩৪.৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে ২০ শয্যার সংক্রমক রোগ ওয়ার্ড।

প্রথমবারের মতো সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হওয়াও রাজ্যের চিকিৎসা ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।


যদিও আগরতলার জিবি হাসপাতাল রাজ্যের স্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রতীক, তবুও উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম ত্রিপুরার জেলা হাসপাতালগুলির অবস্থা এখনো পরিকাঠামোগতভাবে দুর্বল। আধুনিক ডায়াগনস্টিক ল্যাব, উচ্চ ক্ষমতার অপারেশন থিয়েটার, এবং প্রশিক্ষিত স্পেশালিস্ট ডাক্তার—সবই রাজধানীমুখী।


ফলে রোগীরা সামান্য জটিলতার ক্ষেত্রেও আগরতলায় রেফার হতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনই অনেক সময় চিকিৎসা বিলম্বের কারণে প্রাণহানিও ঘটছে।রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়াই এই সমস্যার মূল। রাজধানীর বাইরে কোনও জেলায় সুপার স্পেশালিটি হেলথ হাব গড়ে ওঠেনি এখনো।


বর্তমানে রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা। কিন্তু উনার কাছে রয়েছে আরো বহু দপ্তর।অনেকের অভিমত মুখ্যমন্ত্রীর হাতে অনেক গুলো দপ্তর থাকায় উনি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে পারছেননা। তাঁদের মতে, নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ, ও মাঠপর্যায়ের কার্যকর নজরদারির জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা করে কোনো মন্ত্রী না থাকায় সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিও ধীরগতিতে চলছে।অন্যদিকে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে Agartala Government Staff Council (AGSC)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের দাবি—সংগঠনটি হাসপাতালের উন্নয়নমূলক ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট সক্রিয় নয়।


আজ জিবি হাসপাতালের ভবন, যন্ত্রপাতি, এবং অবকাঠামো আগের তুলনায় বহুগুণ উন্নত। কিন্তু রোগীর প্রতি আচরণ ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে হাসপাতাল এখনো পিছিয়ে।

প্রায়ই অভিযোগ ওঠে—বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু,হাসপাতালের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতার। 


রোগী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রবল। হাসপাতালের ভিতরে মাঝে মাঝে সমাজবিরোধী বা নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অশান্তি সৃষ্টি হয়, যা চিকিৎসক সমাজের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।


১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী আহত শরণার্থীদের চিকিৎসায় জিবি হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সেই সময়ের মানবিক সেবার নজির আজও রাজ্যের ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।

কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে—সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কি এখনো বজায় আছে?


পন্ডিচেরি (Puducherry)-তে ১.২৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে ১৮টি মেডিকেল কলেজ। অথচ ত্রিপুরায় ৪.২২২ মিলিয়ন (৪২ লক্ষ ২২ হাজার) জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মেডিকেল কলেজের সংখ্যা এখনো মাত্র দুইটি—AGMC এবং TMC (Tripura Medical College)।


এই বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসা শিক্ষার অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্য সরকার যদি আগামী দশকে অন্তত প্রতিটি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়, তবে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে।বর্তমান সরকার “মিশন ২০৪৭”-এর আওতায় ত্রিপুরাকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিকাঠামোর দিক থেকে দেশের অগ্রগামী রাজ্যগুলির সারিতে তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে প্রয়োজন হবে—জেলা পর্যায়ে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন,পর্যাপ্ত স্পেশালিস্ট ডাক্তার নিয়োগ,আধুনিক ল্যাব ও যন্ত্রপাতি সংযোজন,প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে রিফারাল লেভেল পর্যন্ত উন্নীত করা। তাছাড়া, চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার না ঘটলে রাজ্যের নিজস্ব মেডিক্যাল ম্যানপাওয়ারের ঘাটতি কাটানো সম্ভব নয়।


ত্রিপুরার প্রত্যন্ত এলাকায় থাকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। কোথাও ডাক্তার নেই, কোথাও ওষুধের অভাব, আবার কোথাও অব্যবহৃত পড়ে আছে যন্ত্রপাতি।সাম্প্রতিক সময়ে জলাই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ বিতরণের ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এনেছে।এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজ্যের বাজেটের বড় অংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করতে হবে এবং স্থানীয় স্তরে জনস্বাস্থ্য কমিটি গঠন করে নজরদারি বাড়াতে হবে।স্বাস্থ্য মানে কেবল হাসপাতাল নয়—এটি হলো মানবিক মূল্যবোধ, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়।

জিবি হাসপাতাল রাজ্যের স্বাস্থ্য সেবার গর্ব, কিন্তু একটি হাসপাতাল গোটা রাজ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারে না।


তাই সময় এসেছে—প্রতিটি জেলা হাসপাতালে সুপার স্পেশালিটি বিভাগ স্থাপন,টেলি-মেডিসিন ও মোবাইল হেলথ ইউনিটের মাধ্যমে গ্রামীণ সংযোগ বৃদ্ধি,স্থানীয় যুবকদের জন্য মেডিক্যাল শিক্ষা প্রসার এবং স্বাস্থ্য দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব নিয়োগ। 


৬৬ বছর পরেও ত্রিপুরার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত রাজধানী-কেন্দ্রিক। জিবি হাসপাতাল নিঃসন্দেহে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থার “প্রাণকেন্দ্র”, কিন্তু একটি রাজ্যের অগ্রগতি তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও রাজধানীর সমমানের চিকিৎসা পায়।


ত্রিপুরার মানুষ চায়—আগরতলার জিবি হাসপাতালের মতো প্রতিটি জেলাতেও গড়ে উঠুক একেকটি আস্থা কেন্দ্র, যেখানে চিকিৎসা মানে হবে মানবতা, সেবা, এবং সমঅধিকার।রাজ্যের স্বাস্থ্য সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড তখনই পূর্ণ হবে, যখন “রাজধানী” নয়, “প্রতিটি জেলা” হবে স্বাস্থ্য উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ