এডিসি এলাকায় ভূমি অধিকার আইনি জটিলতার আড়ালে অউপজাতিদের অস্তিত্ব সংকট, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা
আগরতলা: ত্রিপুরার ভূমি প্রশ্ন নিয়ে যে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে, তার আইনি ভিত্তি এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় গঠিত ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াজ অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি) রাজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে, অথচ সেই এলাকায় বসবাস করে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে।
আইনি কাঠামো ঠিক কী বলছে?
ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী জেলা পরিষদকে জমি বরাদ্দ, ব্যবহার ও হস্তান্তর সংক্রান্ত বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে জমির পাট্টা বা মালিকানার নথি প্রদানের প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকার অভিযোগ তিপ্রা মথা নেতৃত্ব নিজেরাই একাধিকবার স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন হলো এত বছর ধরে যে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল, তা এখন হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে সমাধানের নামে যদি ভুল প্রয়োগ হয়, তার দায় কে নেবে?
মূল আইনি হাতিয়ার হলো ত্রিপুরা ল্যান্ড রেভিনিউ অ্যান্ড ল্যান্ড রিফর্মস অ্যাক্ট, ১৯৬০। এই আইনের ১৮৭ ধারা ও তৎসংলগ্ন সংশোধনী অনুযায়ী তফসিলি জনজাতির নামে থাকা জমি অ-তফসিলি ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে এবং বেআইনিভাবে হস্তান্তরিত বা দখল হওয়া জনজাতি-জমি মূল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার (রেস্টোরেশন) ক্ষমতাও সক্ষম কর্তৃপক্ষকে দেওয়া আছে। একই আইনে সরকারি জমিতে অনুমতি ছাড়া বসবাসকারীকে "অনুপ্রবেশকারী" গণ্য করে উচ্ছেদেরও বিধান রয়েছে। এই ধারাগুলোই এখন প্রয়োগের মুখে এবং এখানেই লুকিয়ে আছে অউপজাতি পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় শঙ্কা। কারণ, দশকের পর দশক আগে যে হস্তান্তর ঘটেছে, বর্তমান বাসিন্দাদের হাতে হয়তো বিকল্প নথিপত্রও রয়েছে কিন্তু "পুনরুদ্ধার" প্রক্রিয়া কঠোরভাবে প্রয়োগ হলে সেই প্রমাণ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, তার কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রশাসনের তরফে এখনও দেওয়া হয়নি।
ত্রিপাক্ষিক চুক্তি: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবায়ন
২০২৪ সালের মার্চে কেন্দ্র, রাজ্য সরকার ও তিপ্রা মথার মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, জমি ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিচয়, সংস্কৃতি ও ভাষা সংক্রান্ত বিষয় মীমাংসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এবং একটি যৌথ কার্যকরী কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছিল। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মাণিক সাহা ও তিপ্রা মথা প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মার বৈঠকে চুক্তি দুই দফায় বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, এবং চলতি মাসেই জমির অধিকার সংক্রান্ত নথি প্রদানের প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হতে পারে বলে সূত্রের খবর। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এত বড় একটি সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া কি জনসমক্ষে স্বচ্ছতা বজায় রেখে, নাকি বন্ধ দরজার আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়ে তারপর জনগণের সামনে চাপিয়ে দেওয়া হবে?
তিপ্রা মথার দাবির সাংবিধানিক ভিত্তি
তিপ্রা মথা সংবিধানের ২ ও ৩ অনুচ্ছেদের আওতায় ১৯টি আদিবাসী জনজাতির জন্য পৃথক রাজ্য "বৃহত্তর তিপ্রাল্যান্ড" গঠনের দাবি তুলেছে, যাতে টিটিএএডিসি এলাকা ছাড়াও ত্রিপুরার বাকি অংশ, আসাম, মিজোরাম ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার তিপ্রাসা জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট দাবির মধ্যে রয়েছে জমির পাট্টাবিহীন পরিবারগুলোকে নথিভুক্ত অধিকার প্রদান, বেদখল জমি ফেরত, টিটিএএডিসি-কে সরাসরি কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ ও নিজস্ব পুলিশ বাহিনী, গ্যাস অনুসন্ধান রাজস্বের অংশীদারত্ব এবং কোকবরক ভাষার জন্য রোমান হরফের স্বীকৃতি। গত বছর তিপ্রাসা সিভিল সোসাইটির আন্দোলনে ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি) চালু এবং "বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী" চিহ্নিতকরণ-প্রত্যর্পণের দাবিও জোরালোভাবে উঠেছিল।
আইনি দাবি যতটা ন্যায্য শোনাচ্ছে, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় ঠিক ততটাই ধোঁয়াশা রয়ে গেছে কোন মানদণ্ডে "বেদখল" নির্ধারিত হবে, কীভাবে যাচাই হবে প্রকৃত মালিকানা, আর কোন সময়সীমার মধ্যে এই বিশাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এসবের কোনো লিখিত, প্রকাশ্য রূপরেখা এখনও সামনে আসেনি।
অউপজাতিদের আইনি ও বাস্তব উদ্বেগ
জমি রেস্টোরেশন আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বা চাষ করা অউপজাতি পরিবারগুলো উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে। আইএলপি চালু হলে যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক বাঙালিদেরও হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে, বিশেষত যাঁদের প্রজন্ম-প্রাচীন নথিপত্র সম্পূর্ণ নেই। টিটিএএডিসি এলাকায় ইতিমধ্যে বলবৎ থাকা জমি ক্রয়-বিধিনিষেধ আরও কঠোর হলে উত্তরাধিকার হস্তান্তরেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। গত বছর অক্টোবরে শান্তিরবাজারে বনধ ঘিরে সংঘর্ষে সরকারি আধিকারিক ও কর্মীরা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, এই আইনি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সঙ্গে সামাজিক উত্তেজনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
"আমরা বাঙালি" সংগঠন ইতিমধ্যে সংবিধানের সপ্তম তফসিলের আওতায় অউপজাতি বাঙালিদের জন্য পৃথক স্বশাসিত আর্থ-সামাজিক অঞ্চল গঠনের দাবি তুলেছে যা প্রমাণ করে, রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ অউপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সম্পদ বণ্টনে ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা কতটা গভীর। বিজেপি ও কংগ্রেস-সিপিআইএম উভয় পক্ষই "বৃহত্তর তিপ্রাল্যান্ড"-কে রাজ্য বিভাজনের সমতুল্য বলে সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকের বক্তব্য
তিপ্রা মথা নেতৃত্ব বারবার আশ্বাস দিয়েছেন, টিটিএএডিসি এলাকায় বসবাসকারী অউপজাতিদের জোর করে উচ্ছেদ করা হবে না এবং তাদের দাবি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। দলটির প্রার্থী তালিকাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অউপজাতি প্রার্থী রয়েছেন। তাদের যুক্তি স্বাধীনতা-পরবর্তী শরণার্থী স্রোতের ফলে জনজাতিরা নিজভূমে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়া ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়া তাদের সাংবিধানিক ন্যায্য দাবি। সিপিআইএমের মতো দল জনজাতিদের সামাজিক-উন্নয়নমূলক দাবির সঙ্গে একমত হলেও পৃথক রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করে।
উপসংহার: জবাবদিহিতার প্রশ্ন
আইন যতই স্পষ্ট হোক, তার প্রয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ১৯৬০ সালের আইনের পুনরুদ্ধার-ধারা প্রয়োগে কোনো স্বাধীন যাচাই ব্যবস্থা থাকবে কিনা, উচ্ছেদের আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কোনো লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া হবে কিনা এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নের এই তাড়াহুড়ো রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী আইনি ও সামাজিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে। আসন্ন ভিলেজ কমিটি নির্বাচন ও ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন আইনি অধিকার নিশ্চিত করার নামে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও সকলের অংশগ্রহণমূলক হবে, তার জবাব কবে মিলবে?
(প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট আইন, ২০২৪ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত।)

0 মন্তব্যসমূহ