প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও রাবারভিত্তিক একফসলি চাষ নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ; ত্রিপুরার দীর্ঘমেয়াদি বনখাত কৌশল নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

 প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও রাবারভিত্তিক একফসলি চাষ নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ; ত্রিপুরার দীর্ঘমেয়াদি বনখাত কৌশল নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা,২ সেপ্টেম্বর:

ত্রিপুরার প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি কৃষক এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি বনখাত কৌশল প্রণয়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বন দপ্তরের সদর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে রাবারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বৃক্ষ ও অর্থকরী ফসলের পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

IGDC-CREFLAT প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ত্রিপুরার প্রধান মুখ্য বনপাল ও হেড অব ফরেস্ট ফোর্সেস (PCCF & HoFF) আর. কে. সামাল, আইএফএস। বৈঠকে বন দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, PMA/PMC-এর প্রতিনিধিরা এবং রাবার স্টাডি টিমের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে IGDC-CREFLAT-এর সিইও ও প্রকল্প পরিচালক এস. প্রভু, আইএফএস বলেন, রাজ্যে অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বনাঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবা সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ বনখাত কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে হিমাচল প্রদেশের প্রাক্তন প্রধান মুখ্য বনপাল ড. সঞ্জীব পাণ্ডে ধলাই, দক্ষিণ ত্রিপুরা, গোমতী, সিপাহীজলা এবং পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে চাষিদের জন্য রাবার চাষ লাভজনক হলেও বৃহৎ পরিসরে একফসলি রাবার বাগানের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য, ছোট নদী-ছড়া ও ঝরনার জলপ্রবাহ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌদামিনী দাস বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের আর্থিক লাভ এবং তাদের সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। রাবার ও আমের পাশাপাশি সুপারি এবং বাঁশ চাষের তুলনামূলক পর্যালোচনায় তিনি জানান, কোনো ফসল ব্যক্তি পর্যায়ে বেশি আর্থিক লাভ এনে দিলেও তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিলে রাজ্যের সামগ্রিক লাভের চিত্র ভিন্ন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র বাজারমূল্য বা কৃষকের তাৎক্ষণিক আয়ের ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহার নীতি নির্ধারণ না করে জলসম্পদ, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ ড. কৌশিক মজুমদার দ্রুতবর্ধনশীল ও উচ্চমূল্যের কাঠজাতীয় বৃক্ষ মালাবার নিম (Melia dubia) চাষের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। বিশেষ করে বনাধিকার আইন বা FRA পাট্টাধারী এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জমির মালিকদের জন্য এটি একটি সম্ভাব্য বিকল্প অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি মত দেন।

বৈঠকে বহুমুখী কৃষিবনায়ন মডেলের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাবারের সঙ্গে আগর, ফলদ বৃক্ষ এবং অন্যান্য উপযোগী প্রজাতির সমন্বিত চাষ কৃষকদের একাধিক আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বাজারদরের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি কমাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে, এই ধরনের বহুমুখী চাষ মাটির জৈব উপাদান সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।বৈঠকে ত্রিপুরার ভবিষ্যৎ বনখাত কৌশল প্রণয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপস্থাপিত হয়

এর মধ্যে রয়েছে-

△ অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের কঠোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। 

Δ বাণিজ্যিক একফসলি বাগানের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করা। 

∆ FRA পাট্টা জমিতে একফসলি চাষ সীমিত করার বিষয়ে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ। বহুমুখী ফসল ও কৃষিবনায়ন মডেলকে উৎসাহিত করা। রাবার ট্যাপিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে দক্ষতাভিত্তিক ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা। এ কৃষকদের কাছে গবেষণালব্ধ কৃষিবনায়ন প্রযুক্তি ও পরামর্শ পৌঁছে দিতে সম্প্রসারণ পরিষেবা শক্তিশালী করা।

△ বনাধিকার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা। 

Δ মালাবার নিম নিয়ে পাইলট প্রকল্পের সিদ্ধান্ত

বৈঠকে বন দপ্তর নির্বাচিত FRA পাট্টা জমি এবং ব্যক্তিগত জমিতে মালাবার নিমের পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রদর্শনী প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি, রাবার স্টাডি টিমকে একফসলি বাণিজ্যিক বাগানের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব এবং এর বহিরাগত ব্যয় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন প্রস্তুতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সভাপতির বক্তব্যে প্রধান মুখ্য বনপাল ও হেড অব ফরেস্ট ফোর্সেস আর. কে. সামাল জানান, বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এবং বৈঠকের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তুত চূড়ান্ত তথ্য ও নীতিগত প্রস্তাব রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পেশ করা হবে।

রাজ্যের বন, জীববৈচিত্র্য, জলসম্পদ এবং গ্রামীণ জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ভবিষ্যতের ভূমি ব্যবহার ও বনখাত নীতি নির্ধারণে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ